পৃথিবীতে কোন কোন দেশ পরাধীন ছিল?
পরাধীনতা একটি দুঃখজনক ইতিহাস, যেখানে কোনো একটি দেশ অন্য একটি শক্তিশালী দেশের শাসনাধীন ছিল। এই প্রবন্ধে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশগুলোর পরাধীনতার ইতিহাস জানব এবং কীভাবে তারা পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছিল, সে বিষয়ে আলোচনা করব।
পরাধীনতার সংজ্ঞা কি?
পরাধীনতা বলতে আমরা সাধারণত একটি দেশের স্বাধীনতা হারানো এবং অন্য একটি দেশের দ্বারা শাসিত হওয়া বুঝি। যখন একটি দেশ নিজস্ব সরকার বা নেতৃত্বের অধিকার হারিয়ে অন্য একটি শক্তিশালী দেশের অধীনে চলে যায়, তখন তাকে পরাধীন দেশ বলা হয়।
পরাধীনতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
পরাধীনতা নির্ধারণের জন্য কিছু মূল উপাদান রয়েছে। প্রথমত, একটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকা; অর্থাৎ, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্য কোনো শক্তিশালী দেশের হস্তক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে দেশের সম্পদ অন্য দেশ দ্বারা শোষিত হওয়া। পরবর্তী ধাপে, এক দেশের জনগণ আরেক দেশের শাসনাধীন হয়ে পড়ে এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা এবং জাতিগত পরিচয় প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।
ভারত: একটি শোষিত উপনিবেশ
ভারত ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপনিবেশগুলোর একটি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে ছিল। ভারতীয় জনগণের শোষণ, অত্যাচার এবং ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে এক যুগান্তকারী স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্ম নেয়।
ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারত
ভারত ছিল ব্রিটিশদের জন্য এক বিশাল সম্পদ। ভারত থেকে তারা বিস্তৃত খনিজসম্পদ, কৃষি পণ্য এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ সংগ্রহ করত। এ কারণে ভারতবর্ষে ইংরেজরা তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ভারতীয় জনগণকে শোষণ করতে থাকে।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল একটি দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু এবং নেহেরুদের নেতৃত্বে ভারতীয় জনগণ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু করে, যা ১৯৪৭ সালে ভারতকে স্বাধীনতা এনে দেয়।
আফ্রিকার দেশগুলি: উপনিবেশী শোষণের শিকার
আফ্রিকা ছিল উপনিবেশী শোষণের একটি বিশাল ক্ষেত্র। এখানে ব্রিটিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ এবং বেলজিয়ানরা তাদের শাসন বিস্তার করেছিল। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশগুলো দীর্ঘ সময় ধরে এসব ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণের শিকার হয়।
কঙ্গো এবং অন্য আফ্রিকান দেশগুলি
কঙ্গো ছিল বেলজিয়ানের জন্য একটি মূল্যবান উপনিবেশ। কঙ্গোর জনগণ তাদের জমি, সম্পদ এবং শ্রমের মাধ্যমে বেলজিয়ানদের এক বিশাল আয়ের উৎস ছিল। এই শোষণ অনেক দুঃখজনক ঘটনাকে জন্ম দেয়।
ফরাসি, ব্রিটিশ ও বেলজিয়ান উপনিবেশের শোষণ
ব্রিটিশ এবং ফরাসি উপনিবেশ আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ফরাসিরা পশ্চিম আফ্রিকায় তাদের আধিপত্য বিস্তার করে, আবার ব্রিটিশরা পূর্ব আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই উপনিবেশী শাসনে হাজার হাজার আফ্রিকান মানুষ দাসের মতো কাজ করেছিল।
এশিয়ার অন্যান্য পরাধীন দেশ
এশিয়ার বিভিন্ন দেশও এক সময় পরাধীন ছিল। চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন সহ বেশ কিছু দেশ বিদেশি শাসকদের অধীনে ছিল।
চীন: অতীতের পরাধীনতা
চীনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং প্রাচীন হলেও এক সময় এটি বিভিন্ন বিদেশি শক্তির শাসনাধীন ছিল। ব্রিটিশ, জাপানী এবং অন্যান্য পশ্চিমী শক্তির শোষণের শিকার হয় চীন।
আধুনিক চীনের উত্থান
চীনের বর্তমান শক্তি আর আগের মতো নয়। বহু বছরের পরাধীনতা এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্ট সরকারের উত্থানে চীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে পরিচিত।
ইন্দোনেশিয়া: কলোনিয়াল শাসন
ইন্দোনেশিয়া ছিল নেদারল্যান্ডসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনিবেশ। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করে এবং দেশটি শাসন করতে শুরু করে।
নেদারল্যান্ডস এবং জাপানী শাসন
ইন্দোনেশিয়ায় প্রথমে নেদারল্যান্ডস এবং পরে জাপানী শাসন ছিল। যদিও ইন্দোনেশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করতে সফল হয়েছিল, তবে দীর্ঘকালীন শোষণের ক্ষত এখনও দৃশ্যমান।
লাতিন আমেরিকার উপনিবেশকৃত দেশগুলো
লাতিন আমেরিকায় স্পেন এবং পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল। স্পেন, পর্তুগাল ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এই অঞ্চলের দেশগুলোকে শাসন করেছিল।
কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা
কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা এক সময় স্পেনের অধীনে ছিল। এই দেশগুলো স্বাধীনতার জন্য অনেক সংগ্রাম করেছে এবং পরবর্তীতে স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
স্পেন এবং পর্তুগিজ উপনিবেশ শাসন
স্পেন এবং পর্তুগাল লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করে বহু বছর ধরে এই দেশগুলোর সম্পদ শোষণ করেছে। তবে, ১৯ শতকে এই দেশগুলোর স্বাধীনতা অর্জন হয়।
বিশ্বযুদ্ধের পর পরাধীনতার অবসান
বিশ্বযুদ্ধের পর বহু দেশ তাদের স্বাধীনতা অর্জন করে এবং উপনিবেশী শাসনকারীদের প্রতিহত করে।
বিশ্বযুদ্ধ এবং পরাধীনতার অবসান
বিশ্বযুদ্ধের পরে, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, উপনিবেশী শক্তির পতন শুরু হয়। অনেক দেশই স্বাধীনতা পায় এবং তাদের নিজস্ব জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করে।
জাতিসংঘের ভূমিকা
জাতিসংঘের প্রভাবও পরাধীনতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক চাপ এবং বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতার আন্দোলনের ফলে উপনিবেশগুলি ধীরে ধীরে মুক্তি লাভ করেছে।
পরাধীনতা ও স্বাধীনতার মধ্যে পার্থক্য
পরাধীনতা এবং স্বাধীনতার মধ্যে মূল পার্থক্য হল একটি দেশের নিজস্ব শাসন এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা।
পরাধীনতা বনাম স্বায়ত্তশাসন
স্বায়ত্তশাসন মানে একটি দেশ নিজের শাসন ব্যবস্থা স্থাপন করে, যেখানে পরাধীনতা মানে অন্য দেশের শাসনের অধীনে থাকা।
স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়া
স্বাধীনতা অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে দেশগুলো নানা সংগ্রাম, আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা অর্জন করে।
আজকের পৃথিবীতে পরাধীনতা: কতটা আছে?
আজকের পৃথিবীতে অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও, পরাধীনতা আর তেমন বিদ্যমান নয়। তবে কিছু দেশে রাজনৈতিক বা আর্থিক আধিপত্য বজায় রয়েছে।
অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্য
বিশ্বের কিছু দেশের উপর শক্তিশালী অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক আধিপত্য রয়েছে, যা তাদের স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।
নতুন ধরনের আধিপত্য: আর্থিক ঋণ ও দুর্বল রাষ্ট্র
আজকের দিনে অনেক দেশ ঋণের কারণে পরোক্ষভাবে পরাধীন অবস্থায় রয়েছে। এই আধিপত্য সরাসরি শাসন নয়, বরং আর্থিক ঋণ ও শর্তের মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়।
উপসংহার: পরাধীনতা এবং স্বাধীনতা
পৃথিবীর অনেক দেশই এক সময় পরাধীন ছিল, তবে তারা সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তবে, স্বাধীনতা অর্জন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। পরাধীনতা আমাদের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হলেও, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং সংগ্রামী মনোভাব আমাদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে।
FAQs
পরাধীনতা বলতে কী বোঝায়? পরাধীনতা মানে একটি দেশের স্বাধীনতা হারানো এবং অন্য একটি দেশের শাসনে চলে যাওয়া।
ভারত কখন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল? ভারত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে।
আফ্রিকার কোন দেশগুলি সবচেয়ে বেশি শোষিত হয়েছিল? কঙ্গো, নাইজেরিয়া, এবং অন্যান্য পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলি ব্রিটিশ ও ফরাসি উপনিবেশ শাসনে ছিল।
আজকের দিনে কোন দেশে পরাধীনতা বিদ্যমান? আজকের দিনে সরাসরি পরাধীনতা নেই, তবে কিছু দেশ অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের অধীনে রয়েছে।
পৃথিবী থেকে পরাধীনতার অবসান কেন ঘটেছে? বিশ্বযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আন্দোলন এবং জাতিসংঘের প্রচেষ্টার ফলে পরাধীনতা ধীরে ধীরে শেষ হয়েছে।
কথোপকথনে যোগ দিন